ভারতের ‘ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল-২০২৬’ বা বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইনে নতুন পরিবর্তন আনার সরকারি উদ্যোগকে কেন্দ্র করে দেশটির জাতীয় রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাবিত এই সংশোধনীটি সংসদে উত্থাপনের আগেই বিরোধী শিবিরের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।
কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা ও কেরালার তিরুবনন্তপুরম আসনের লোকসভা সংসদ সদস্য শশী থারুর সরকারের এই পদক্ষেপকে একহাত নিয়েছেন। তার মতে, এটি কোনো সাধারণ আইনি সংশোধন নয়; বরং এর মাধ্যমে রাষ্ট্র ও স্বাধীন নাগরিক সমাজের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভারসাম্যকে একপক্ষীয়ভাবে ধূলিসাৎ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
নির্বাহী ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণ ও আইনি কাঠামোর পরিবর্তন
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত এক কলামে শশী থারুর উল্লেখ করেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীটি নির্বাহী বিভাগ বা আমলাতন্ত্রকে একচ্ছত্র ও নজিরবিহীন ক্ষমতার অধিকারী করবে। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রের বিদ্যমান আইনি সুরক্ষা ও জবাবদিহিতাকে এড়িয়ে প্রশাসনিক নির্দেশে বেসরকারি ট্রাস্ট বা সামাজিক সংস্থার ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
থারুরের দাবি, ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী আদর্শ বাস্তবায়নে কাজ করছে, যেখানে স্বাধীন মতামত বা প্রশ্ন তোলার সংস্কৃতিকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এফসিআরএ আইনের কঠোর প্রয়োগের কারণে ইতোমধ্যেই বিদেশি অনুদান পাওয়ার হার প্রায় ৮৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে দেশজুড়ে হাজার হাজার অলাভজনক, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে নিবেদিত সংগঠন নিজেদের কার্যক্রম পুরোপুরি গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
বর্তমানে এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত তিনটি উৎসের মাধ্যমে টিকে থাকে:
- স্থানীয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অনুদান
- প্রাতিষ্ঠানিক ও অভ্যন্তরীণ সেবামূল্য (ফি)
- আন্তর্জাতিক দাতাসংস্থার থেকে আসা আইনি অনুদান
এই সম্মিলিত অর্থের মাধ্যমেই আধুনিক চিকিৎসার যন্ত্রপাতি কেনা, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের স্কলারশিপ দেওয়া এবং স্বল্পমূল্যে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। নতুন আইন প্রণীত হলে এনজিও বা এনপিও (Non-Profit Organization) খাতের এই দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সম্পদ অধিগ্রহণের বিধান: চরম অনিশ্চয়তায় জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান
প্রস্তাবিত এফসিআরএ বিল-২০২৬-এর সবচেয়ে বিতর্কিত দিকটি হলো লাইসেন্স বাতিলের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি (যেমন জমি, ভবন, হাসপাতাল ও বিদ্যালয়) বাজেয়াপ্ত করার প্রশাসনিক ক্ষমতা।
থারুর সতর্ক করে বলেন, এই বিধানটি চালু হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা সামান্য নথিপত্র সংক্রান্ত বিলম্বের অজুহাতে মুহূর্তের মধ্যে বহুতলবিশিষ্ট দাতব্য হাসপাতাল কিংবা শতাব্দীপ্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। এতে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগী ও শিক্ষার্থীরা হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা এসব কমিউনিটি সম্পদ এভাবে সরকারি বাজেয়াপ্তের আওতায় আনাকে তিনি গভীর অন্যায় বলে আখ্যা দেন।
জাতীয় নিরাপত্তা বনাম নাগরিক সমাজ:
দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এই নীতিগত পরিবর্তন ও রাজনৈতিক তর্কের বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে উভয়পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন:
- পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি (সরকার ও সমর্থকদের অবস্থান):
কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধরনের কঠোর আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো জাতীয় নিরাপত্তা সুদৃঢ় করা এবং দেশের অভ্যন্তরে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বহিরাগত প্রভাব রোধ করা। বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত অনেক সংস্থা প্রায়শই অনিয়ন্ত্রিতভাবে অর্থ লেনদেন করে, যা ক্ষেত্রবিশেষে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি বা উন্নয়নমূলক কাজে বাধার কারণ হতে পারে। তাই স্বচ্ছতা আনা, আন্তর্জাতিক অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমিকতা সুরক্ষায় এই আইনি সংস্কার অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়।
নেগেটিভ দৃষ্টিভঙ্গি (সমালোচক ও বিরোধী শিবিরের মতামত):
অন্যদিকে সমালোচকদের দৃষ্টিতে এটি নাগরিক সমাজের স্বাধীন স্বরকে স্তব্ধ করার একটি প্রশাসনিক কৌশল। অলাভজনক খাতকে অতিরিক্ত আইনি বেড়াজালে আবদ্ধ করলে প্রান্তিক পর্যায়ে সেবামূলক কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে কোনো সংস্থাকে নিশানা করা এবং তাদের সম্পদ অধিগ্রহণের সুযোগ থাকলে তা শেষ পর্যন্ত দেশের দরিদ্র ও সাধারণ নাগরিকদের চিকিৎসাসেবা ও মৌলিক শিক্ষা লাভকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।
উপসংহার
সংসদে বিলটি উত্থাপিত হওয়ার পর এই বিতর্ক আরো তীব্র রূপ নেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আন্তর্জাতিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা যেমন রয়েছে, তেমনি দীর্ঘদিনের সামাজিক সেবামূলক ট্রাস্ট ও এনজিওগুলোর স্বকীয়তা বজায় রাখাও জরুরি। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে কীভাবে এই আইনের ভারসাম্য রক্ষা করা যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।