ঢাকা, ২০২৬: মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আবারও ঘনীভূত হচ্ছে এক ভয়াবহ যুদ্ধের কালো মেঘ। গত জুন মাসে স্বাক্ষরিত বহুল আলোচিত সমঝোতা স্মারক (MoU) মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সম্পূর্ণ ভেস্তে গেছে। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে চলমান অভূতপূর্ব পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলায় পুরো অঞ্চলে একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার তীব্র আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারির পর গতকাল তেহরানও সাফ জানিয়ে দিয়েছে—তারা আর এই সমঝোতা চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য নয়। ফলে দুই পরাশক্তির এই মারমুখী অবস্থানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ার নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে
সমঝোতা চুক্তির অকাল মৃত্যু: শান্তি আলোচনা থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে
চুক্তির মূল শর্তগুলো কী ছিল?
- স্থায়ী যুদ্ধবিরতি: সব ধরণের সামরিক উসকানি ও সংঘাত চিরতরে বন্ধ করা।
- হরমুজ প্রণালি সচল করা: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের এই লাইফলাইনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
- অবরোধ প্রত্যাহার: ইরানের প্রধান বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।
- চূড়ান্ত চুক্তি: পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়া।
তবে এই শান্তিপ্রক্রিয়া স্থায়িত্ব পায়নি। ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে কাতার ও পাকিস্তানের শীর্ষ নেতাদের মধ্যস্থতায় দুই দেশের প্রতিনিধিরা বৈঠকে বসেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পরপরই পর্দার আড়ালে আলোচনা ভেস্তে যায় এবং নতুন করে শুরু হয় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।
সামরিক হামলা থেকে বেসামরিক অবকাঠামো: সংঘাতের নতুন মাত্রা
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) দাবি করেছে, তারা টানা সপ্তম দিনের মতো ইরানের নজরদারি ব্যবস্থা, সামরিক রসদ, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডার ও নৌঘাঁটি লক্ষ্য করে নিখুঁত হামলা চালিয়েছে। তবে তেহরানের দাবি ভিন্ন। ইরান সরকারের মতে, হোয়ایت হাউস এখন শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইরানের সাধারণ মানুষের লাইফলাইন—যেমন বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, সেতু, টেলিকমিউনিকেশন টাওয়ার এবং পানি শোধনাগারের ওপর নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করছে।
ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান (গত ১০ দিনের চিত্র):
- ইরানে মোট প্রাণহানি: নতুন করে সংঘাত শুরুর পর ৬ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন।
- অবকাঠামোগত বিপর্যয়: ইরানের হরমোজগান প্রদেশে ১১৬টি টেলিকমিউনিকেশন টাওয়ার অচল হয়ে পড়েছে। খুজেস্তান প্রদেশের ৯৫টি স্থানে মার্কিন হামলায় পানির পাম্প ও বিদ্যুৎ গ্রিড ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় কয়েক ডজন গ্রামে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
ইরানের পাল্টা আঘাত: জর্ডানে মার্কিন সেনা নিহত ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা
যুক্তরাষ্ট্রের এই লাগাতার হামলার জবাবে চুপ করে বসে নেই ইরানও। দেশটির শক্তিশালী সামরিক শাখা 'ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী' (IRGC) প্রতিবেশী ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঝাঁক ছুড়েছে।
- জর্ডানে মার্কিন সেনার মৃত্যু: জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের আকাশসীমা প্রতিরক্ষা ভেদকারী ড্রোন হামলায় ২ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং ১ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এ নিয়ে গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় মিলিয়ে ১৬ জন মার্কিন সামরিক সদস্য প্রাণ হারালেন।
- কুয়েত ও বাহরাইনে আঘাত: কুয়েতের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
- সংঘাতের भौगोलिक বিস্তার: গত তিন মাসের মধ্যে এই প্রথম সৌদি আরব এবং সিরিয়ার মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট এলাকায় ইরানের হামলা চালানোর খবর পাওয়া গেছে, যা যুদ্ধকে বহুমুখী ফ্রন্টে রূপ দিচ্ছে।
আলটিমেটাম ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার কোনো লক্ষণ তো নেই-ই, বরং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক লিখিত বিবৃতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করছে, যা প্রমাণ করে মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের কোনো আন্তর্জাতিক ‘মূল্য বা কার্যকারিতা নেই’।
lounges ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সমঝোতা চুক্তি থেকে তেহরানের আনুষ্ঠানিক সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। দেশটির জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি ওয়াশিংটনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন:
যুক্তরাষ্ট্র যদি আর দু-তিন দিন এভাবে তাদের আগ্রাসন ও অবকাঠামো ধ্বংসের নীতি বজায় রাখে, তবে তেহরান চুপ থাকবে না। আমরা মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে 'সর্বাত্মক সামরিক অভিযান' শুরু করতে বাধ্য হব।
কাতারভিত্তিক স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আরব পারস্পেকティブস ইনস্টিটিউট’-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেইদন আলকিনানি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—বিশ্বের কোনো পরাশক্তি, জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা এই মুহূর্তে যুদ্ধ থামাতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছে না। আন্তর্জাতিক আইন এখন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
বিশ্লেষণ ও দ্বিমুখী মন্তব্য (Critical Analysis)
এই চলমান ভূরাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য নিচে একটি পজিটিভ এবং একটি নেগেটিভ মূল্যায়ন তুলে ধরা হলো:
পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি (কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনা)
মন্তব্য: যুদ্ধাবস্থা চরম রূপ নিলেও, ইতিহাস বলে যে মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়াতে পর্দার আড়ালে সবসময়ই ব্যাক-চ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি বা গোপন কূটনীতি সক্রিয় থাকে। কাতার এবং পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এখনো দুই পক্ষের সাথেই যোগাযোগ রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই অতিরিক্ত সামরিক চাপ হয়তো ইরানকে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কোনো পরমাণু বা কৌশলগত চুক্তিতে বাধ্য করার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হতে পারে। দুই পক্ষই যখন বুঝতে পারবে যে সর্বাত্মক যুদ্ধে কোনো পক্ষেরই জয় সম্ভব নয়, তখন হয়তো আরও শক্তিশালী কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির পথ সুগম হবে।
নেগেটিভ দৃষ্টিভঙ্গি (আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিপর্যয়)
মন্তব্য: চলমান এই বাস্তবতায় শান্তির সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং ইরানের পক্ষ থেকে জর্ডান বা কুয়েতের মতো সার্বভৌম রাষ্ট্রে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। এটি কেবল দুটি দেশের যুদ্ধ নয়; হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যার ধাক্কা লাগবে বাংলাদেশসহ পুরো এশিয়ায়। জাতিসংঘ ও বিশ্বনেতাদের এই ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকা প্রমাণ করে যে, আমরা একটি নিয়মহীন ও চরম অস্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে যেকোনো মুহূর্তে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হতে পারে।
ট্যাগস: মধ্যপ্রাচ্য সংকট, যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধ, ডোনাল্ড ট্রাম্প, মোজতবা খামেনি, হরমুজ প্রণালি, ভূরাজনীতি ২০২৬, আন্তর্জাতিক সংবাদ।
তবে এই শান্তিপ্রক্রিয়া স্থায়িত্ব পায়নি। ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে কাতার ও পাকিস্তানের শীর্ষ নেতাদের মধ্যস্থতায় দুই দেশের প্রতিনিধিরা বৈঠকে বসেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পরপরই পর্দার আড়ালে আলোচনা ভেস্তে যায় এবং নতুন করে শুরু হয় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।
সামরিক হামলা থেকে বেসামরিক অবকাঠামো: সংঘাতের নতুন মাত্রা
ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান (গত ১০ দিনের চিত্র):
- ইরানে মোট প্রাণহানি: নতুন করে সংঘাত শুরুর পর ৬ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন।
- অবকাঠামোগত বিপর্যয়: ইরানের হরমোজগান প্রদেশে ১১৬টি টেলিকমিউনিকেশন টাওয়ার অচল হয়ে পড়েছে। খুজেস্তান প্রদেশের ৯৫টি স্থানে মার্কিন হামলায় পানির পাম্প ও বিদ্যুৎ গ্রিড ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় কয়েক ডজন গ্রামে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
ইরানের পাল্টা আঘাত: জর্ডানে মার্কিন সেনা নিহত ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা
- জর্ডানে মার্কিন সেনার মৃত্যু: জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের আকাশসীমা প্রতিরক্ষা ভেদকারী ড্রোন হামলায় ২ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং ১ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এ নিয়ে গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় মিলিয়ে ১৬ জন মার্কিন সামরিক সদস্য প্রাণ হারালেন।
- কুয়েত ও বাহরাইনে আঘাত: কুয়েতের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
- সংঘাতের भौगोलिक বিস্তার: গত তিন মাসের মধ্যে এই প্রথম সৌদি আরব এবং সিরিয়ার মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট এলাকায় ইরানের হামলা চালানোর খবর পাওয়া গেছে, যা যুদ্ধকে বহুমুখী ফ্রন্টে রূপ দিচ্ছে।
