খেলাধুলা ডেস্ক: ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রোমাঞ্চকর ফাইনালে স্পেনের কাছে শিরোপা হারানোর পর থেকে চরম মানসিক হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো প্যারেদেস। ফাইনাল ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠের অনাকাঙ্ক্ষিত হাতাহাতি এবং শিরোপা হাতছাড়ার তীব্র কষ্ট—এই দুই মিলেই এখন তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে এনে দাঁড় করিয়েছে এক অনিশ্চিত মোড়ে। জাতীয় দলের জার্সি চিরতরে খুলে রাখার ব্যাপারে গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করছেন ৩২ বছর বয়সী এই আলবিসেলেস্তে তারকা।
মেজাজ হারিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে প্যারেদেস
স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামার পর থেকেই বেশ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে দেখা যায় প্যারেদেসকে। একাধিক কড়া ফাউল করলেও ম্যাচের মূল রেফারি তাকে কোনো কার্ড দেখাননি। তবে বিতর্কের আসল সূচনা হয় ম্যাচ শেষ হওয়ার পর।
স্প্যানিশ উইঙ্গার এরিক গার্সিয়া ও মিডফিল্ডার গাবির সঙ্গে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে মেজাজ হারিয়ে বসেন প্যারেদেস। গার্সিয়াকে ধাক্কা দেওয়ার পাশাপাশি গাবির জার্সি টেনে হিঁচড়ে তাকে মাটিতে ফেলে দেন তিনি। কোনো বড় টুর্নামেন্টের ফাইনাল শেষে এমন অনভিপ্রেত আচরণ বিশ্ব ফুটবলে নিন্দার ঝড় তুলেছে। খেলাধুলাপ্রেমী ও বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে আর্জেন্টাইন এই তারকার মানসিক নিয়ন্ত্রণের অভাব হিসেবেই দেখছেন।
শৈশবের ক্লাব বোকা জুনিয়র্সে ফিরে বিষাদের সুর
বিশ্বকাপের ধকল সামলে নিজের পুরোনো ক্লাব বোকা জুনিয়র্সে যোগ দিয়ে প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন প্যারেদেস। তবে তার কণ্ঠে ছিল শুধুই হতাশা আর অবসাদের ছাপ। জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন:
"আমি নিশ্চিত নই যে এই মুহূর্তে জাতীয় দলের হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার মতো মানসিক অবস্থা আমার আছে কি না। ফাইনালে যা ঘটে গেছে, তা মেনে নিতে সময় লাগবে। আবেগের বশে নয়, ঠান্ডা মাথায় সবকিছু চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।"
বিশ্বকাপ হাতছাড়ার যন্ত্রণা সহজে দূর হওয়ার নয় তা স্পষ্ট করেই জানান এই মিডফিল্ডার। তিনি যোগ করেন:
"এই হার অনেক দিন কষ্ট দেবে। আমরা শিরোপার একদম কাছাকাছি পৌঁছেও খালি হাতে ফিরেছি। তবে পুরো টুর্নামেন্টে দল যেভাবে খেলেছে এবং সমর্থকরা যেভাবে আমাদের পাশে ছিল, সে জন্য আমি গর্বিত।"
আলবিসেলেস্তেদের এক যুগের অবসান?
২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে আর্জেন্টিনার যে সোনালি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল—যার ধারাবাহিকতায় ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক ট্রফি এসেছে—সেই প্রজন্মের অনেকেই এখন বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে। প্যারেদেসের মতে, আর্জেন্টিনা দলে এখন বড় ধরনের রিল্যাফ বা পরিবর্তন আসার সময় হয়ে গেছে।
একই সঙ্গে এই উচ্চমানের পারফরম্যান্স ধরে রেখে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের দীর্ঘদিন জাতীয় দলে টেনে নেওয়া কঠিন হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
স্পেনের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার
মাঠের ভেতর বা বাইরের যাবতীয় বিতর্ক দূরে ঠেলে বিজয়ী দল হিসেবে স্পেনকেই নম্বর ওয়ান মানছেন প্যারেদেস। তিনি খোলামেলাভাবেই স্বীকার করেছেন, "পুরো টুর্নামেন্টে আমরা দারুণ খেলেছি ঠিকই, কিন্তু ফাইনালে স্পেন আমাদের চেয়ে অনেক ভালো খেলেছে। শিরোপাটা তাদেরই প্রাপ্য ছিল।
🔍 নিরপেক্ষ ও কৌশলগত বিশ্লেষণ (বিশেষ মতামত)
এই সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলে দুটি স্পষ্ট ও ভিন্নমুখী দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে:
🟢 ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি (Positive Perspective)
মাঠে স্পেনের শ্রেষ্ঠত্বকে নির্দ্বিধায় মেনে নিয়ে লিয়েন্দ্রো প্যারেদেস একজন পেশাদার অ্যাথলেটের পরিচয় দিয়েছেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর নিজের মানসিক অবস্থাকে প্রাধান্য দিয়ে অবসর নিয়ে চিন্তাভাবনা করাটা অত্যন্ত পরিণত ও যৌক্তিক এক সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে, দল হেরে গেলেও তরুণদের জায়গা ছেড়ে দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে আর্জেন্টিনার দায়িত্ব সঁপে দেওয়ার মানসিকতা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।
🔴 নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি (Negative Perspective)
তবে একজন অভিজ্ঞ ও বর্ষীয়ান খেলোয়াড় হিসেবে ফাইনাল ম্যাচের পর স্প্যানিশ তরুণ ফুটবলারদের ওপর চড়াও হওয়া এবং হাতাহাতিতে জড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের অর্জিত সম্মান ও স্পোর্টসম্যানশিপকে বিশ্বমঞ্চে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শিরোপা হারানোর চরম হতাশায় আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করা তার মতো অভিজ্ঞ তারকার থেকে কাম্য ছিল না।